স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি পরিচ্ছন্ন বয়ান

স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি পরিচ্ছন্ন বয়ান

উমারা হাবীব


বইটি হাতে পেয়ে একটানে শেষ করলাম। স্মৃতিকথায় ইতিহাসের বয়ান। হ্যাঁ, বাংলাদেশ সৃষ্টিকারী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়েই এই বই। এদেশের বহু মানুষ মুক্তিযুদ্ধের কথা নানানভাবে উপস্থাপন করেছে, কিন্তু মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী এই স্মৃতিকথা লিখেছেন এক ঐতিহাসিক ধূম্রজালকে সামনে রেখে। বিব্রত ও মর্মপীড়িত হৃদয় নিয়ে। বইয়ের নামটি পড়লেই সচেতন মানুষের অনুভবে উৎস সম্পর্কে ধারণা এসে যাবে। 

স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কার্ড খেলবার যে গেইম, সেটা যে কতটা ভিত্তিহীন ও দুর্বল—তা এই বই পাঠ করলে বোঝা যাবে। আরও প্রতীয়মান হবে, জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের সমর্থন ও উপস্থিতি সমালোচনাযোগ্য ছিল না। চিহ্নিত গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ইসলামকেন্দ্রীক ছিল না। পাকিস্তানের বৈষম্যবিরোধী সক্রিয়তাই বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে উপনীত করেছে। ছয় দফাকে মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ধরা হয়। ছয় দফার কোথাও ইসলাম সম্পর্কিত কোনো কথা নেই। নেই সেক্যুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো কথা। স্বাধীন দেশে একদল জোরপূর্বক ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতিকে মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করায়। 

এ কথাটি ভূমিকার মধ্যে স্পষ্ট করে লিখেছেন এদেশের স্পষ্টবাদী সৎ সাহিত্যের দিকপাল মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। তিনি লিখেছেন, 'ইসলামের বিপক্ষেও মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, কুফুরের পক্ষেও মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের বিরুদ্ধে।'

এই বইয়ে এমনতরো কঠিন কঠিন সত্য সাহসী লেখক লিখে গেছেন। যার কিঞ্চিৎ উদাহরণ দেওয়া যায়।


এক. 

"আমার প্রাণপ্রিয় উস্তাদ মাওলানা অলিউর রহমান পাক হানাদারদের হাতে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যাকালে একত্রে শহিদ হয়েও মীরপুরের বুদ্ধিজীবী হত্যার স্মারক মিনারে শহিদের তালিকায় উল্লেখ হয়নি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই যে মওলানা জালালাবাদী আওয়ামী লীগের ৫১ পুরানা পল্টনস্থ কেন্দ্রীয় দফতরে পঁচিশে মার্চের কালো রজনীতেও বিশ্বস্ত সৈনিকের মতো অবস্থান করছিল, তারপর মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলা বেতারের উদ্বোধন করেছিল—সে আমারই হাতেগড়া আপন ছোটভাই।"


দুই.

"সালুটিকর বিমানঘাঁটি থেকে গোয়াইনঘাটের দূরত্ব ৯/১০ মাইল মাত্র। বিমানঘাঁটিতে সামরিক তৎপরতা জোরদার। ঢাকা-সিলেট বিমান উড়ছে ঘন ঘন। যেকোনো সময় সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত নিরাপদ করার স্বার্থে গোয়াইনঘাট থানা সদরে সামরিক বাহিনীর হামলা হতে পারে। তাই এলাকাবাসীরা আটাশটি গ্রামের লোকজনকে একত্র করে কুরআন শরিফ খতম ও দোয়ার মজলিসের ব্যবস্থা করেছে। প্রচুর লোক-সমাবেশ হবে সন্দেহ নেই। আমি ভাবলাম, আমার বক্তব্য প্রচারের এটা একটা মোক্ষম সুযোগ। যথাসময়ে মজলিসে হাজির হয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। ২৫/৩০ জন আলেমও আছেন মজলিসে। গণ্যমান্য মুরব্বিগণও উপস্থিত। স্থানীয় থানার অফিসার ইনচার্জই এলাকার সবচাইতে গণ্যমান্য সরকারি লোক। তিনি আবার মুক্তিবাহিনীর প্রধানও।"


তিন.

"আমরা মৌলবি হয়ে মুক্তিবাহিনীর দৃষ্টিতে খতরনাক, আর বাঙালি হয়ে পাকবাহিনীর দৃষ্টিতেও নাপাক। অপরাধ না করেও উভয় বাহিনীর দৃষ্টিতে আমরা অপরাধী। যুক্তির যেখানে বালাই নেই, শক্তিমান যেখানে তার শক্তি দিয়েই অপরাধীর সংজ্ঞা নির্ণয় করে, সেখানে জীবন থাকে চরম অনিশ্চিত। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস ও তার পরবর্তী দীর্ঘকাল পর্যন্ত এ দেশের আলেম সমাজকে এ উভয় সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই জীবন কাটাতে হয়েছে।"

এমন অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে ছোট্ট এই বই থেকে। যা ইতিহাসের স্বচ্ছ সত্য। 

বই বিষয়ে মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীনের আরেকটি উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা শেষ করছি। তিনি লিখেছেন, 

"এই বইয়ে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রীক মাওলানা জালালাবাদী যে নির্মম সত্যটি তুলে ধরেছেন, ভণ্ডদের তৈরি এই 'সত্যের করাত' প্রতিদিন দ্বিখণ্ডিত করেছে এবং এখনও করছে এদেশের দীনদার শ্রেষ্ঠ মানুষদের। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণটি রেখে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলল এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। তিনি তাদের রাজাকার বলে বসলেন। অথচ শিক্ষার্থীদের দাবি যে হক ও ন্যায্য–এ কথা তিনিও মানলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতও মানল–এবং প্রমাণ হলো, যারা হক কথা বলেন, এভাবেই তাদের রাজাকার বলে রক্তাক্ত করা হয়। ধর্মাপরাধীদের এই রাজাকার তত্ত্বের এক জীবন্ত এক্স-রে রিপোর্ট এই বক্ষ্যমাণ গ্রন্থ।" 

সুতরাং প্রিয় সচেতন অনুসন্ধানী সত্যান্বেষী পাঠক! ইত্তিহাদ থেকে প্রকাশিত বইটি এক 'পলকে' পড়ে ফেলুন। আর স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি পরিচ্ছন্ন বয়ান জানুন।