মানুষের মুখের কথার অনেক রূপ। এই রূপের একটি হলো—বয়ান। বয়ান মূলত কথামালার সমষ্টি। সাধারণ থেকে অনন্য হওয়ার কারণে তার এই অভিধা। বয়ানের একটি বিশেষত্ব হলো, তা কখনো কখনো দলিল হয়ে যায়। তখন তার থেকে সৃষ্টি হয় ইতিহাস। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস, আমার চোখে এর ধারাক্রমটি এরকম—কথা থেকে বয়ান, বয়ান থেকে ইতিহাস।
যেহেতু এই রূপবদলের বিষয়টি নিতান্ত কথা থেকে অকাট্য প্রমাণ হয়ে ওঠার ভিত্তিতে হয়, তাই এখানে তথ্যের বিভ্রাট আর সত্যমিথ্যার সংমিশ্রণের ব্যাপার থাকে। থাকে রাজনীতি, দলাদলি, মতবাদ ও মতভেদের অনেক বিষয়। তখন প্রকৃত বাস্তবতা জানতে হলে এগুলোকে ছেঁকে দেখতে হয়। কথা আর দলিলকে মাপতে হয় নিরপেক্ষ নিক্তিতে। এক্ষেত্রে ইতিহাসের চলমান সময় ও বাস্তবতাকে নিজের চোখে দেখেছেন, এমন ব্যক্তির সাক্ষ্যদান হয়ে ওঠে বড় প্রমাণ। ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা আমি রাজাকার’ বইটি এমনই এক প্রামাণ্য।
এই বইয়ের লেখক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন কিংবদন্তি। একাত্তরে টালমাটাল সময়টা তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। ২৫ মার্চের কালো রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস—পুরো সময়টা নিরীক্ষণ করেছেন তিনি। সাতচল্লিশের দেশভাগে ধর্মীয় ইস্যু প্রধান বিষয় হলেও একাত্তরের দেশভাগের ইস্যু ছিল রাজনৈতিক। প্রধানত রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর আগ্রাসন চালিয়েছিল। তাই তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানের জাতপাতের বিচার করেনি; আক্রোশ থেকে সবাইকে মেরেছে নির্বিচারে।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদিনার ভেতরে যেমন মুনাফিক ছিল, তেমনই একাত্তরের প্রেক্ষাপটে এই দেশে গড়ে উঠেছিল কিছু মুনাফিক চক্র। ইতিহাস তাদেরকে ‘রাজাকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সেসময় রাজাকারদের ‘আকার-আকৃতি’ মনে রাখা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি; এর প্রয়োজনও ছিল না। কারণ আমরা মুনাফিকদের ইতিহাস পড়লে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি পড়ি। কার দাড়ি কত লম্বা ছিল, কে কী টুপি পরত—এসব অহেতুক প্রশ্ন মাথায় আনি না। তেমনিভাবে একাত্তরের রাজাকারদেরও এই দেশের মানুষ তাদের মন্দ চরিত্রের কারণে মনে রেখেছে, পোশাক বা আকৃতি দিয়ে নয়।
কিন্তু আমরা দেখতে পাই, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাজাকারদের চিহ্নিত ও চিত্রায়িত করা হয়েছে দাড়ি-টুপির আকৃতিতে। বলা হয়েছে, ধর্মের লেবাস পরেই তারা অধর্মের কাজ করেছে। একদল সংস্কৃতিবাদী, দেশপ্রেমী তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতি আর দেশপ্রেমের কথা বলে; বিশেষ করে একাত্তরের চেতনার দোহাই দিয়ে এমনটা করেছে। মূলত এটা তারা প্রচণ্ড ইসলামবিদ্বেষ থেকেই করেছে। বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় জনতা আলেমদের প্রতি যে শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব রাখে, একে দূষিত করতে এরকম ঘৃণ্য কুচেষ্টা করেছে তারা।
এই দেশকে ভালোবেসে, জাতীয়তার প্রশ্নে আপস না করে অনেক আলেম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সেই তাদের সম্মানের প্রতীক দাড়ি-টুপিকে রাজাকারের চিহ্ন আখ্যা দিয়ে তাদেরকেই বানিয়ে দেওয়া হলো রাজাকার! মাওলানা জালালাবাদী এটা নিয়ে সাহসিক উচ্চারণ করেছেন—‘দেশকে ভালোবাসা যদি মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় হয়, তবে আমি একজন প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধা, আর টুপি-দাড়ি ধর্মীয় প্রতীক যদি হয় রাজাকার আলবদরের পরিচয়, তবে এই পরিচয়েও আমিই এদেশের শ্রেষ্ঠ রাজাকার।’
এই বইটি এমন সব সত্যের আখ্যান ও সাহসিক উচ্চারণে ভরপুর। লেখক নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকে তুলে ধরেছেন সবকিছু। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আগ্রহী পাঠক ও জনসাধারণ; বিশেষ করে ‘জেনজি’ তারুণ্যকে—যারা ‘রাজাকারের নাতিপুতি’র আখ্যা পেয়ে জ্বলে ওঠে আগুনের গোলা হয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী স্বৈরাচারীকে—সবাইকে উদাত্ত আহ্বান জানাই : মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হলে এই বইটি অবশ্যই পড়ুন!